Rock-e-Boshe Adda 

অদ্ভুতুড়ে – কলকাতার হানাবাড়িগুলির ইতিহাস

প্রথম পর্ব

 

“চিরকাল এই-সব রহস্য আছে নীরব, রুদ্ধ-ওষ্ঠাধর ।
জন্মান্তের নবপ্রাতে সে হয়তো আপনাতে, পেয়েছে উত্তর ” – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভৌতিক শব্দটির বেশ এলেম আছে। কারোর মনে এটি ভয়ের উদ্রেক করে আবার কারোর মনে কৌতূহলের। তবে যাই হোক না কেন, আর পাঁচটা মুখরোচক বিষয়ের মধ্যে ভূতপ্রেতের আলোচনা বাঙালীদের বেশ প্রিয়। ছোটবেলায় মা-দিম্মার মুখে যতবার ভুতের গল্প শুনেছি ততবারই মনে হয়েছে ভুতপ্রেত যাই থাকুক না কেন আমাদের ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলে তাদের ঠাঁই নেই। বরং তাদের আস্তানা হোলো পোড়ো বাড়ি, অন্ধকার রাস্তা, শহরের বাইরের কবরস্তান, বা কোন জঙ্গল। বড় হবার সাথে সাথে অবশ্য সেই ধারনার খুব একটা বদল না ঘটলেও এই তালিকায় যোগ হয়েছে আরও কিছু সম্ভাব্য স্থান যেখানে অশরীরীদের আভাস পেলেও পাওয়া যেতে পারে, যেমন প্রত্যন্ত গ্রামের পুরনো জমিদার বাড়ি, বড় বাবুদের বাগানবাড়ি, শ্মশান ঘাটগুলি, ইত্যাদি।

বয়সের সঙ্গে আমাদের ভুত বিষয়ক কৌতূহলের ধরনটাও পালটে যায়। আগে যেটা সীমিত থাকত গল্পে, বইয়ের পাতায় বা উপন্যাসে, এখন কিন্তু তার বিস্তার ঘটেছে। প্ল্যানচেট করা, ভৌতিক ভিডিও বা ডকুমেন্টারি দেখাআমাদের আশেপাশে অশরীরীদের অস্তিত্ব খোঁজায় এখন বেশী আগ্রহী আমরা, যাকে বলে টোটাল থ্রিল।

এক রবিবারের দুপুরে কলকাতা সম্বন্ধে একটি লেখা পড়তে গিয়ে জানতে পারলাম আমাদের এই স্বপ্নের, আহ্লাদের শহরের রংচঙে দিকের পাশাপাশি আরেকটা রূপ আছে। খাস কলকাতার বুকেই রয়েছে এমন কিছু জায়গা যেখানে নাকি তেনাদের বাস। ব্যাস, যেমনি পড়া অমনি কাজ, বেরিয়ে পড়লাম সেই সব জায়গাগুলির খোঁজ লাগাতে। কথায় বলে, চাইলে নাকি ভগবান খুঁজলেও পাওয়া যায়, আর এক্ষেত্রে তো এনারা নিজেরাই নিজেদের অস্তিত্বের আভাস দিয়ে থাকেন।

তোমাদের জন্য রইল কলকাতার কিছু চিহ্নিত হানাবাড়ির তালিকাঃ

১। মহাকরণ (Writer’s Building)
ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই স্থানীয় প্রশাসনিক ভবনটি প্রায় ৩০০ বছর পুরনো। শোনা যায়, এই ভবনেই নাকি রয়েছে অশরীরীর বাস। কোন কর্মচারীই এখানে সন্ধ্যে ৭’টার পরে আর কাজ করতে চাননা। রাত বাড়ার সাথে সাথেই ভেসে আসে অদ্ভুত আওয়াজ। বিশালাকায় এই ভবনের ৫নম্বর ব্লকের বারান্দাটিও খুব একটা সুবিধের নয়। ওখানে গেলেই নাকি কেমন শীত-শীত অনুভূতি হয়। সংস্কারের কাজ চলার দরুন এই ভবনটি এখন বন্ধ আছে। আশা করা যায় নতুন ভাবে এই ভবন খুললে বিদায় নেবে এই ভুতুড়ে ছায়াও।

ইতিহাসঃ বিশাল এই দপ্তরটি যে জমির ওপরে নির্মিত, আগে নাকি সেখানে ছিল কলাগাছের ঘন জঙ্গল যেখানে খুন, জখম লেগেই থাকতো। এই জমিতেই হতো ঘোড়ায় টানা গাড়ির খেলা বা ডুয়েল আর বন্দুকযুদ্ধ। অতীতের সেই বিখ্যাত ঘটনা ঘটে এখানেই – বিনয়, বাদল, দিনেশের হাতে নিহত হন অত্যাচারী সিম্পসন সাহেব।

ঠিকানা Binoy Badal Dinesh Bag N, Murgighata, Lal Dighi, Kolkata – 700001.

Image Courtesy: The Hindu

২। পুতুলবাড়ি (Putul Bari or the Infamous Doll-House, Sovabazar)
শোভাবাজারের আহিড়িতলা ঘাটের কাছে অবস্থিত এই পুতুলবাড়িটি হল কলকাতার সবথেকে রহস্যময় স্থানগুলির মধ্যে অন্যতম। বাড়িটি রোমান স্থাপত্যের আদলে তৈরি করা হয়েছে এবং তার মধ্যে রয়েছে পুতুলের ভাস্কর্য। এখনো ওই বাড়ির নিচেরতলাতে লোকজন বাস করলেও, বিকেলের পর দোতলা বা তিনতলাতে ওঠার সাহস করেননা কেউই। রাত বাড়লেই গোটা পুতুলবাড়িটি হয়ে ওঠে এক ভয়াবহ জায়গা যেখানে কখনো শোনা যায় মহিলাদের চিৎকার ও কান্নার শব্দ, কখনো বা শোনা যায় নূপুরের ধ্বনি। সত্যজিৎ রায় এবং লীলা মজুমদারের লেখাতেও এই বাড়িটির উল্লেখ পাওয়া যায়। ভাঙাচোরা বাড়ির চেহারা, গঙ্গার জলের ও হাওয়ার শব্দ আর রাতের অন্ধকার, সবমিলিয়ে এই পুতুলবাড়ি বেশ ভয়ের জায়গা।

ইতিহাসঃ এই বাড়িটির সাথে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ বঞ্চনার ইতিহাস। শোনা যায় আগেরকারদিনে বাবুরা বা জমিদারেরা মহিলাদের এই বাড়িতে নিয়ে এসে করতো অকথ্য অত্যাচার। পরবর্তীকালে নাকি এক বিত্তশালী মনিব বসবাস করতেন এইখানে। বাড়িটির দেখাশোনা করার জন্য রেখেছিলেন কয়েকজন দাসীকেও। এবং তাদের সাথেই নাকি প্রতি রাতে জোরকরে অশালীন আচরণ করতেন। এমনকি তারা প্রতিবাদ করলে, খুন পর্যন্ত করা হতো তাদের। বহু পরে রাজাদের হস্তক্ষেপে যদিও বন্ধ করা হয় এই অত্যাচার, তবুও মুছে যায়নি সেই বাড়ি থেকে কলঙ্কের, যন্ত্রণার ইতিহাস। চির অভিশপ্ত হয়ে যায় এই পুতুলবাড়ি।

ঠিকানাঃ SL Chatterjee St, Sarada Palli, Nimta, Kolkata – 700049.

৩। রয়াল ক্যালকাটা টার্ফ ক্লাব (Royal Calcutta Turf Club)
ব্রিটিশ আমলে, ১৮৪৭ সালে নির্মিত হয় এই বিশালাকায় ঘোড়দৌড়ের ময়দানটি। বিনোদন ও ব্যবসার পাশাপাশি, এই রেসকোর্সটি ভৌতিক কার্যকলাপের জন্যও বেশ জনপ্রিয়। লোকেরা বলেন, এখনো কোন এক পূর্ণিমার রাতের শনিবারে রেসকোর্সের পাশ দিয়ে গেলে নাকি দৌড়তে দেখা যায় এক সাহেব ও তার ধবধবে সাদা ঘোড়াকে। এই ঘটনার সত্যতা যদিও কেউ যাচাই করে দেখেনি, তবে ইতিহাসের দেওয়ালে কান পাতলেই শোনা যায় এক সাহেব ও তার ঘোড়ার কাহিনী।

ইতিহাসঃ ১৯৩০ সালের ঘটনা। জর্জ উইলিয়াম নামের এক সাহেব ঘোড়দৌড়ে আসক্ত ছিলেন। সাহেবের অনেকগুলি ঘোড়ার মধ্যে, প্রাইড নামক ধবধবে সাদা ঘোড়াটি ছিল সবথেকে প্রিয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রাইড দুর্বল হয়ে যায় এবং একদিন দৌড়ে হেরে যায়। তারপরেরদিন সকালে, প্রাইডের মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায় ওই ময়দানেই। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই প্রাইডের শোকে মৃত্যু ঘটে স্যার উইলিয়ামের। শারীরিক মৃত্যু ঘটলেও, উইলিয়াম সাহেব ও তার ঘোড়াকে নাকি আজও আলাদা করা যায়নি কলকাতার এই রেসকোর্স থেকে।

ঠিকানাঃ Hospital Road, Race Course, Hastings, Kolkata – 700027.

৪। আকাশবাণী ভবন (All India Radio, Kolkata)
১৯২৭ সালের ২৬শে অগাস্ট, ১ নং গারস্তিন প্লেসে শুরু হয় আকাশবাণীর বেতার সম্প্রচার। ইংরেজ আমল থেকেই বেশ নামডাক ছিল প্রসারভারতীর এই বেতার শাখাটির। সবই ঠিক ছিল কিন্তু হঠাৎ শুরু হওয়া ভৌতিক উপদ্রবের কারণে সব কর্মচারীরাই ওখানে কাজ করতে গররাজী হন। রাত্রিবেলা প্রায়শই হ্যাট-কোট পরা এক সাহেবকে ঘুরে বেড়াতে দেখাযেত। কখনো রেকর্ডিং রুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেতো এক মহিলাকে, আবার কখনো ফাঁকা ঘরে শোনা যেতো পিয়ানোর টুংটাং। টেকনিশিয়ান থেকে তৎকালীন শিল্পীরা অনেকেই অনুভব করেছেন এই অশরীরীদের উপস্থিতি। এইসব কারণেই, পরবর্তীকালে, আকাশবাণী ভবনের স্থান পরিবর্তন হয়। আজও গারস্তিন প্লেসের সেই ছোট্ট জরাজীর্ণ বাড়িটির পাশদিয়ে গেলে গা ছমছম করে ওঠে।

ইতিহাসঃ কথিত আছে এই বাড়িটিতেই নাকি এক সাহেব এবং এক মহিলা আত্মহত্যা করে কোন এক অজানা কারণে। তারপর থেকেই গোটা বাড়িটিতে টের পাওয়া যায় তাদের উপস্থিতি।

পূর্ববর্তী ঠিকানাঃ 1, Garstin Pl, BBD Bagh, Kolkata – 700001.

৫। গণেশ টকিজ এলাকা (পোস্তা) – Near Girish Park
খুব সম্প্রতি শোনা যাচ্ছে পোস্তার গণেশ টকিজ এলাকায় কোন এক আগন্তুক এসে জল চাইছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে। তারা জল দিতে গেলে দেখেন উধাও সেই ব্যক্তি। আশেপাশে কোথাও তার হদিশ পাওয়া যায়না, এমনকি কেউ নাকি দেখতেও পায়না এই আগন্তুককে। আবার সন্ধ্যেবেলা নাকি ওই এলাকা থেকেই ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে কেউ উঠে বসে, তবে ট্যাক্সি চললেই নাকি উধাও হয়ে যায় পেছনের সীটে বসে থাকা সেই ব্যাক্তি। ঘটনাটির সত্যতা প্রমাণ না হলেও, সাম্প্রতিক অতীতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা এই প্রেতান্ত্যাদের উপস্থিতির কারণ হতেই পারে। স্থানীয় দোকানদারেরা তাই আগের মতন আর বেশী রাত পর্যন্ত থাকেননা ওখানে।

সাম্প্রতিক ইতিহাসঃ ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ, গিরীশ পার্ক এলাকার বিবেকানন্দ সেতু আচমকাই ভেঙে পড়ে নির্মাণগত ত্রুটির কারণে। অনেকে আহত হবার পাশাপাশি, প্রাণ হারায় বহু মানুষ। জনবহুল এলাকায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে দুপুর ১২:৪০ নাগাদ। প্রকাণ্ড ওই সেতুর তলায় চাপা পড়ে যায় গাড়ি, বাস ও মানুষেরা। দুদিন ধরে চলে উদ্ধার কাজ। বলা হচ্ছে, ওই নিদারুণ দুর্ঘটনায় যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন, তাদের অতৃপ্ত আত্মাই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে ওই এলাকায়।

ঠিকানাঃ Kali Krishna Tagore St, Bara Bazar, Raja Katra, Kolkata – 700007.

                                                                                                                                   (চলবে…)

Related posts

Leave a Comment