Featured Gorom Moshla 

স্মৃতিময় “ঝুলন”

Reading Time: 2 minutes

রোজকার কর্মব্যস্ত সকালের মতোই, সেদিনও আমি চায়ের কাপটা বারান্দার টেবিলের উপর রেখে ইংরেজি খবরের কাগজটায় চোখ বোলাছিলাম, যদিও পাশেই রাখা ছিল বাঙালির অতি পরিচিত খবরের কাগজটাও. হঠাৎ মোবাইল ফোনে একটা মেসেজ “HAPPY JHULAN” কিছুক্ষণের জন্য বেশ অবাক লাগলেও নিজের অজান্তেই চোখটা ঠিক চলে গেল পিছনে টাঙানো বাংলা ক্যালেন্ডারের দিকে. যতই বছরের প্রথমদিন থেকে সেটা বাড়ির দেওয়ালে থাক না কেন. মোবাইলের যুগে আজকাল দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডার আর চোখেই পড়ে না. দেখলাম, তারিখটার তলায় স্পষ্টভাবে লেখা… “ঝুলন পূর্ণিমা”
 

কথায় বলে বাঙালির বারো-মাসে ১৪ পার্বণ, কিন্তু সেইসব চেনা পার্বণের মধ্যে ‘ঝুলন’ ঠিক কোথায় ? আজকের প্রজন্মের কতজনই বা জানে ঝুলনের কথা? কিন্তু বেশ কয়েকবছর আগেও তো আমাদের চেনা গণ্ডির মধ্যেই ঝুলন উৎসব হিসেবে পালিত হত, এখনও হয়, কিন্তু সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে রোজকার দৌড়ে আমাদের তা চোখে পড়ে না, আবার  হয়তো বা পড়ে, কিন্তু সেটা বোঝার বোধ-টা হারিয়ে ফেলেছি আমরা . আজকাল যৌথ পরিবার ভেঙে  তৈরী হয়েছে ‘আমি-তুমি পরিবার’, দিনের সাথে-সাথে সেটাও হারিয়ে যাবে, তৈরী হবে আমার আর আমার মোবাইলের পরিবার .আসলে আমাদের জীবনকে আজকাল তীব্র আলোর রোশনাই ,শক্ত শক্ত কিছু শব্দ, ঝাঁ-চকচকে পরিবেশ গ্রাস করে ফেলেছে আর যার মধ্যেই হারিয়ে গেছে জীবনের অল্পে খুশি থাকার রসদটা. আমাদের কাছে আনন্দও আজকাল বাহ্যিক সুন্দরতা দাবি করে . হারিয়ে গেছে ছেলেবেলার ভেদাভেদ ভুলে সবাই মিলে ঝুলন সাজানোর সেই একরাশ আনন্দ ,ছোট ছোট জিনিস দিয়ে তৈরী করা রাধা-কৃষ্ণের সেই ভালোবাসার কিছু মুহূর্ত, আর  জীবনে একান্তে নয় সবার সাথে কাটানো কিছু অমূল্য সময়. আর মনের মধ্যে চেপে রাখা প্রতিযোগিতা, সেরা হওয়ার. সত্যি বলতে কী, সময় শুধু সমাজের গতিই পাল্টায়নি, তার সাথেই পাল্টে দিয়েছে মানুষের চিন্তাধারা, দৈনন্দিন চাহিদা, জীবনযাপনের ধরনও. আজকাল আকাশচুম্বী উঁচু ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়িয়ে পাড়ার ছেলেমেয়েদের মনখোলা চিৎকার কানে আসে না. নির্ভেজাল আনন্দটাই চাপা পড়ে গেছে, সমাজের কিছু কঠিন সত্যির আড়ালে। বাড়ির উঠোনগুলো এখন আর অপেক্ষা করে না নতুন ঝুলনের গল্পের, কারণ ভালোবাসাও এখন শৌখিনতার দাস।
 

শোনা যায় বর্ষাকালে রাধা কৃষ্ণের ভালোবাসা উৎযাপন করার জন্যই  নাকি পালিত হতো এই উৎসব.  বৃন্দাবন, মায়াপুর, মথুরা, ইস্কন এইসব জায়গায় ঝুলন আজও বেশ কয়েকদিন ধরেই সাড়ম্বরে পালন করা হয়. অনেক মানুষ সেই সময় এখানে অংশগ্রহণ করতে আসে, শুধু দেশের নয় বিদেশের মানুষের সমাহার হয়. আসলে উৎসব মানে তো আক্ষরিক অর্থে মানুষের সাথে মানুষে মিলন, তাতে আবার কিসের রকমফের ? কেনই বা সবাই করছে বলেই, আমিও করবো. সবাই জানে না বলেই, আমিও জানাবো না. আমিও উৎসবের দিনগুলোর সকালবেলায় নিজের প্রিয় সোশ্যাল সাইটে একটা ছবি দিয়ে অনেকগুলো কথা লিখে নিজের চেনা প্রিয় পার্বণটাকে একেবারে অচেনা করে দেব .তাহলে কি একদিনের ছুটি পার্বণকে চিহ্নিত করে ? কেনই বা আমাদের ছোটবেলা, আমাদের চেনা উৎসব, আজকের প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বইয়ের পাতায় ,গল্পে , সোশ্যাল সাইটের স্মৃতি চারণায় খুঁজে বেড়াবে? .জীবনে এগিয়ে যাওয়ার মানে তো হারিয়ে যাওয়া নয়!
 

তাই মনে হয়, সকালের চায়ের সাথে খবরের কাগজের মাঝে-মধ্যে বদল ঘটতেই পারে. এমন যদি হয় ফোনের বদলে, উৎসবের দিনটার জানান দেবে দেয়ালের এককোনে ঠাঁই পাওয়া ‘ব্রাত্য’ ক্যালেন্ডারটি. ঝুলন শুধু জায়গা বিশেষে পালিত না হয়ে, পালিত হবে সবার মধ্যে নিজের নিজের মতো করে. তাহলেই তো মানুষ উন্নতির সাথে সাথে পাশে নিয়ে চলবে নিজের ঐতিহ্যকে, উৎসব যে রূপেই আসুক তাকে মুছে দেওয়া যাবে না, তাকে দিতে হবে একটা নতুন রং “ভালোবাসার” . চলার পথে যা হারিয়ে যায় সেটা “সময়” আর যেটা থেকে যায় সেটাই জীবনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কারণ . আজকের সাজানো ঝুলনও গল্প বলবে ,আমাদের বদলে যাওয়ার গল্প . 

 

Related posts

Leave a Comment